স্মৃতির সরণী বেয়ে
জীবনখাতার পাতা থেকে । পর্ব ১
( স্বর্গীয় শ্রীযুক্তা অর্চনা সেনগুপ্ত স্মরণে)
জীবনটা ঠিক একটা ক্যানভাসের মতো। সময়ের সাথে সাথে তাতে কত রঙ, কত আলো, কত ছায়া প্রতিনিয়ত পালাবদল করে। কোনো রং গাঢ় হয়, চেতনার গায়ে আঁচড় কাটে। আবার কোনো রং চিরদিন থাকে নেপথ্য প্রেক্ষাপটে, কিন্তু হালকা হয়ে। এই যে আজ এটুকু বুঝতে পেরেছি ,ছোটোবেলা কি অতটা বুঝতে পারতাম? কিন্তু জীবনের ক্যানভাসে এই রঙ তুলির খেলা শুরু হয়ে যায় শৈশব থেকেই।
কিছু কিছু মানুষ আমাদের শৈশব এবং তারপর আমাদের বড় হওয়ায় অনেকটা জুড়ে থাকলেও আমরা অনেক সময় তাদের এই কৃতিত্বপর্ব টা প্রায় ভুলে থাকি কিংবা সেটা তো আমাদের প্রাপ্তি ছিল এই ভেবে অযত্নে ফেলে রাখি। আমি ঠিক তাই করেছি এতদিন। কিন্তু যত বড় হয়েছি খুব কাছ থেকে দেখা এই একটা মানুষকে নিয়ে লেখার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে উঠেছে। তিনি আমার ঠাম্মা শ্রীযুক্তা অর্চ্চনা সেনগুপ্তা (নামটা তিনি যেভাবে সাক্ষর করতেন, সেভাবেই লিখলাম)।
মনে হতেই পারে,নিজের মা-বাবা ঠাম্মা দাদু নিয়ে তো সবাই লেখেন। এ আর এমন কি!কিন্তু শুধু আমার ঠাম্মা বলেই মানুষটির গল্প লিখতে আমি বসিনি। এক নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকেই এই মানুষটির কথা আমার যতবার মনে পড়ে, ততই আশ্চর্য হই ।
আমরা পাঁচ ভাই-বোন। আমি আর ভাই যমজ সন্তান হওয়ায় ঠাম্মা মায়ের সুবিধের জন্য আমাকে নিজের কাছে রাখতেন । একেবারে এক/দুই বছর বয়স থেকেই (ঠাম্মা কে বলতাম ভাই)। ভাইয়ের বিছানা, বালিশ কোলবালিশ, কিয়োকারপিন তেল, বোরোলিন, পূজা ঘরের অগুরুর গন্ধ - এসব এখনো আমায় এক স্বর্গীয় আনন্দ দেয়। হ্যাঁ দুপুর থেকে রাত অব্দি ভাইয়ের বিছানা আর তার ঘর এটাই ছিল আমার বাসস্থান । এজন্য অন্য ভাই বোনরা আমায় হিংসে করতেও ছাড়তো না। কেননা খাওয়াটা অব্দি ভাইয়ের সঙ্গে ছিল । যত বিশেষ খাবার তার বরাদ্দ ছিল, তার কিয়দংশ তো আমার পেটেও যেত। এছাড়া ঝাল মাছের তরকারি তে লাল মরিচ টিপে নিজে যেমন, খেতেন আমাকেও খাওয়াতেন।
চা-বাগানে বাবার কোয়ার্টারেই আমাদের ছেলেবেলাটা কেটেছে। তারপর ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য মা যখন শহরে কোয়ার্টার নিলেন, (মা সরকারি চাকুরি করতেন) তখন আমার জীবনের একেবারে নাটকীয় মোড়। চা বাগান থেকে শহরের দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার । প্রতি শনি রবিবারে বাড়ি আসার প্রতিশ্রুতি । তাও ঠাম্মার মুখ ভার। বিষাদময় পরিবেশ। যেন সন্তানকে তার মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে । ভাইয়ের কাঠের আলমারি তে আমার ভালো জামা গুলো উনার শাড়ির পাশে গুছিয়ে রাখা থাকত। সেদিন রাগে-দুঃখে সেই আলমারি থেকে আমার জামাগুলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে ছিলেন মায়ের সামনে। সঙ্গে সংলাপ যুক্ত করেছিলেন। 'উচ্চশিক্ষায় বিদেশযাত্রা অনেকেই করেন, তুমিও যাও উচ্চশিক্ষা নাও'। বলাবাহুল্য আমার বয়স তখন মাত্র সাত বছর । আর আমি তখন এসবের মানেও বুঝি না । এই চোখের জল, এই অধিকার প্রবণতা, এই দুঃখের দাম দিতে শিখিনি তখনও।
এরপর শহরের মায়ের কোয়ার্টারের পরিবেশ,পড়াশোনার চাপ ,নতুন বন্ধুবান্ধব এসব কিছুর মাঝেও একটি দশ বাই বারো ফুটের ঘর আমাকে ভীষণভাবে টানত। একটি বিছানা ,তার দুদিকে দুটো জানালা । একটি হাতের বা দিকে। একটি মাথার দিকে। জানালাগুলোতে লোহার শিক, আর তার ফাঁকে বিশাল আকাশ। আকাশ ছোঁয়া ফুলের গাছ। আর মাথার দিকে জানালায় ফল হীন একটি আম গাছের ছায়া-- এই সবকিছু যেন এই বিছানাটিকে আগলে রাখত। দুপুর বেলার এই একটি নিশ্চিন্ত আশ্রয় যেন দৈনন্দিন কোলাহল থেকে আমাকেও অনেক দূরে সরিয়ে রাখত। বলা হয় , নিস্তব্ধতা, একাকীত্ব, কোলাহলহীনতা- মানুষের সৃষ্টিশীলতা বাড়ায় । একথা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। এই যে ছোটোবেলা থেকেই নিজের সাথে নিজের কথা বলার অভ্যাস এবং সুযোগ,আমাকে আজও লিখতে প্রেরণা যোগায়। আর এই পরিবেশের জন্মদাতা ওই দশ বাই বারো ফুটের ঘর। আর তাই বন্ধ পেলেই শহর থেকে দে 'ছুট চা বাগানের কোয়ার্টারে।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখা ছাড়াও, ভাইয়ের মুখে শোনা অনেক গল্পের সাক্ষী হতাম রোজ। কিছুটা বুঝতাম, কিছুটা বুঝতাম না। না বোঝাগুলোকে গবেষণা দ্বারা বুঝে নেবার চেষ্টা করতাম। কিছু গল্প একবার দুবার নয়, অনেকবার শুনতে হত। শুনতে হত, সকাল থেকে শুরু হওয়া মাথার পাশে থাকা রেডিওটা। তাতে গানই চলুক কিংবা চাষাবাদের কথা। শুনতে হত সব। রেডিও-চরিএদের সাথে তখন থেকেই পরিচয়। না, ভাইয়ের কাছে কখনো ঠাকুরমার ঝুলির গল্প শুনিনি। যা আসলে সবাই শুনে থাকেন ঠাকুমা- দিদিমার কাছে। আমরা শুনতাম বড়োদের গল্প। বিশ্বাস করবেন না, বনফুলের গল্প শুনতাম, সেই ছোটো বয়সেই উনার কাছে। এছাড়া থাকত পরিবারের কত মানুষের কথা। উনার নিজের প্রথম প্রেমের গল্প। অপছন্দের বিয়ে, এসব বৃত্তান্ত। এইসব শুনতে গিয়ে ছোটোবেলা থেকেই পাকা হয়ে গেছিলাম। আমাদের বাড়িতে তখন জেলা গ্রন্থাগার থেকে বই আসতো । আনতেন আমার কাকু । পাঠক ছিলেন ,ঠাম্মা, কাকু আর আমার এক মাসতুতো দিদি । আমি লুকিয়ে পড়ার চেষ্টা করতাম। কেন করতাম সেটাও আজ বুঝি। দুপুরবেলার খাওয়া-দাওয়া পরই যখন ভাইকে গোগ্রাসে গিলতে দেখতাম বইগুলো। আর কখনো আনন্দে, কখনো দুঃখে - পাত্রীর বয়স কত তা না ভেবেই আমাকে সব অনুভূতির ভাগ দিতেন। তখন স্বভাবতই নিষেধের বেড়া ভাঙতে কার না ইচ্ছে হয়। একবার স্পষ্ট মনে আছে তখন আমি ক্লাস এইট । বাড়িতে এসেছিল মনি শংকরের একটি ছোটগল্প সংকলন । দুপুরবেলা লুকিয়ে পড়তে গিয়ে ধরা পড়ে গেছিলাম মাসতুতো দিদির কাছে। এত বেশি বকেছিল যে দাদু এসে কারণ জানতে চাওয়ায়, দিদি সেই পৃষ্ঠার দুটো লাইন দাদুকে পড়ে শুনিয়ে বলেছিল -"বলুনতো দাদু এই বয়সে এসব ওর পড়ার"? বেশি কিছু ছিল না তাতে। নায়কটি নায়িকার হাতে চিমটি কেটে সংলাপ বলছিল। এটুকুই যা। দাদু মুচকি হেসে ভেতরে চলে গেলেন । কিন্তু আমার অতৃপ্তিতে আগুন জ্বলতে লাগলো । হ্যাঁ এমনটাই ছিল শাসন। বড়োদের বই পড়া যাবে না। বড়দের সিনেমা দেখা যাবে না । এমনকি অর্ধেক সিনেমা দেখার পরও ঠেলে ঘুমোতে পাঠানো হতো। বড়োদের সাথে মেলামেশা বারণ। ছেলেদের সাথে কথা বলা বারণ । এখানে বলে রাখি, এসব শাসন বাবা-মা কোনোদিন করেননি। করেছেন অন্যরা। বাবা-মা শুধু সমর্থন করেছেন । আজকের সমাজের শাসন প্রণালীর চিত্রটা যদিও অন্য।
না, ভাই কোনোদিন শাসন করেন নি। বরং প্রশ্রয় দিয়েছেন। কিন্তু সেই প্রশ্রয় ক্ষতিকর ছিলো না কোনোদিনই। বরং পড়াশোনা করা আর ভালো মেয়ে হওয়ার বাইরেও যে একটা জগত আছে , সেইসব জগতের সন্ধান তার কাছেই পেয়েছিলাম প্রথম।
পর্ব - ২
কেমন ছিলেন আমার ঠাম্মা দেখতে? বলা যায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত সুন্দরী । ছিপছিপে গঠন, উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রঙ,,টিকোলো নাক, চোখের মনিটা কালো ছিল না । ছিল একটু ঘোলাটে। চেহারাতে এতটাই ব্যক্তিত্ব ছিল যে, তৎকালীন সব বয়স্কাদের থেকে তাকে একটু আলাদা লাগতো। সাদা চুলের লম্বা নাকধারী এই মহিলাটির চেহারা প্রায় ইন্দিরা গান্ধীর সাথে মিলে যেত । অনেকে সেটাই বলতেন । কোনোদিন কুচি দিয়ে শাড়ি পরতে দেখি নি । বরং সাধারণ প্যাঁচ দিয়ে পড়া শাড়ি এবং পরিপাটি ব্লাউজে অসাধারণ লাগত দেখতে। কপালে বড়ো লাল সিঁদুরের ফোটা আর সিঁথি ভরা সিঁদুর পরে সেজেগুজে একা একা বাগান থেকে বাসে করে শহরে মিশনে ঠাকুরের তিথিতে যেতেন । সত্যিকারের স্মার্টনেস কাকে বলে আজ বুঝতে পারি। না, ভাই কোনো বাইরের কাজে যুক্ত ছিলেন না। তবুও বাইরে ঘরে কতটা স্মার্ট ছিলেন। সময়ে খাওয়া, সময়ের সব কাজ সময়ে করা এসব অনুশাসন তার সহজাত ছিল। মনে পড়ে, একবার ক্লাস থ্রিতে আমি আর ভাই বাসে করে বাগানে আসছিলাম স্কুল থেকে। যদিও শহরে মার কোয়ার্টারে থাকতাম, কিন্তু প্রায়ই বাগান থেকে আসা যাওয়া চলত । সেদিন টিনের বক্সে(আমাদের বাল্যকাল যারা দেখেছেন, তারা সবাই এই টিনের বক্সটি চিনবেন) বইয়ের সাথে আমাদের দুজনের চশমাও ছিল। ছোটো থেকেই দুই ভাই-বোন চশমার ভার নিয়েছিলাম চোখে। গল্প করতে করতে দুজন বাস থেকে নেমে পড়লাম । বাস চলে গেল আমাদের বাগানের কোয়ার্টার পেরিয়ে কোনো আরেক মফস্বলের দিকে । বাড়ি গিয়ে রীতিমতো প্রচণ্ড গালি। চুপ করে বসে থাকলাম। সঙ্গে সঙ্গে ভাই রেডি হয়ে গেলেন । সেই ধবধবে সাদা লাল পেড়ে শাড়ি, সাধারণ করে পরে ,হাতে ছোট্ট একটা পার্স নিয়ে পরের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। বাস এলে উঠে গেলেন একা একা । প্রায় আধ ঘন্টা রাস্তা পার হয়ে আগের বাসটি যেখানে গেছে, সেই বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে হাজির। গিয়ে দেখলেন একটিমাত্র বাস দাঁড়ানো যাত্রীর অপেক্ষায় । ভাই উঠে গেলেন বাসটিতে। উঠে দেখেন, ড্রাইভার স্টিয়ারিং এর উপর মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। আর তার মাথার পাশে আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া টিনের বক্স । তিনি নিঃশব্দে একটি সিটে বসে পরলেন। কেন না জানতেন, বাসটি আবার আমাদের বাড়ির দিকে ফিরবে। যথাসময়ে বাসটি আমাদের টিলার নিচে এসে থামল । (টিলার উপর কোয়ার্টার ছিল) বিজয়ীর মতো হাতে বক্স নিয়ে নামলেন ঠাম্মা। সেদিন ভাইয়ের জন্যই পরবর্তী গঞ্জনাগুলো থেকে রক্ষা পেয়ে ছিলাম আমরা ।
সুন্দরী বলে মারাত্মক অহংকার ছিল এই মহিলার। তাঁর সব সময় মনে হতো ,জীবন থেকে তাঁর যতটুকু প্রাপ্য ছিল ততটুকু তিনি পাননি। সিলেটের জমিদার বংশে জন্ম ছিল তাঁর। পদবী ছিল চৌধুরী । বাড়ি সিলেটের আমলসীদ এ। বিয়ে হয়েছিল দুলালীর সেনগুপ্ত বংশে। দুটোই জমিদারবাড়ি। যখন বিয়ে হয়েছিল ভাইয়ের বয়স ছিল উনিশ,দাদুর একুশ। তৎকালীন সময়ে বয়সের দিক দিয়ে বিয়েটা অনেক আধুনিক বলা যায় । বিয়ের সময় দেশে যুদ্ধ চলছে । দেশ স্বাধীন হওয়ার যুদ্ধ। ঠাম্মার একমাত্র দাদা তখন সেনাবাহিনীতে । ঠাম্মার যখন বিয়ের কথাবার্তা চলছে তখন তার কাকাই একমাত্র অভিভাবক। কাকার পছন্দ হয়েছিল দাদুকে। তৎকালীন সময়ে মেট্রিক পাশ ,উচ্চ বংশের সৎ ছেলে আর কী চাই । তখন দাদু আইজলে কিছু ব্যবসার কাজে ছিলেন। বিয়ের পর ভাইয়ের কোর্টে চাকরি করা কাকাই দাদুকে সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন । এই নিয়ে ঠাম্মা কতদিন যে দাদুকে কথা শোনাতেন । এসব ঝগড়ার সাক্ষী হতাম আমরা। মোটকথা দাদুকে উনার খুব বেশি পছন্দ ছিল না। বিয়েতে আপত্তিও জানিয়েছিলেন । তার কাকা শোনেননি । বিয়ের দিন প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে দাদু বিয়ের কুঞ্জে ঢুকেছিলেন। বাসররাতে জ্বরে কাতর লালচোখ ওই কালো ভদ্রলোককে একা রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন ঠাম্মা। ভয়ে না স্বপ্নভঙ্গের ব্যাথায় জানিনা। কিন্তু কেন ?"তোমার কি কোন প্রেম ছিল"? এই প্রশ্নটা বড়ো হয়ে করেছি ঠাম্মা কে । বলেছিলেন 'হ্যাঁ'।ঠিক প্রেম নয়। কিন্তু একজন আত্মীয় আসতেন বাড়িতে । সম্ভবত বোনের দেবর বা সেরকম কেউ । নাম ছিল শিশির । ভাইয়ের ডাকনামও ছিল শিশির । এ নিয়ে বোনেরা ক্ষ্যাপাতো তাকে। ব্যাপারটা হয়তো এখানেই থেমে গিয়েছিল । কিন্তু থেমে না গেলে হয়তো অন্য কিছু হতে পারত, উনার মুখ দেখে বুঝতে পেরেছিলাম। চুপি চুপি জিজ্ঞেস করেছিলাম, "রঙ ফরসা ছিলো"? বলেছিলেন, 'হ্যাঁ, তা একটু ছিলো'। এই একটা ব্যাপার ছিল ঠাম্মার মধ্যে। রঙের ব্যাপারে সাংঘাতিক রক্ষণশীল ছিলেন। দাদুকে অপছন্দের কারণই ছিল, দাদুর রঙ কালো কুচকুচে ,মাথায় টাক। ফলে কালো মানুষের প্রতি একটা অবজ্ঞা তার ছিল। কালো মেয়েকে কে নেবে -এই ভাবনাটা যেমন উনার ছোটো মেয়ের মাথায় ঢুকিয়ে ছিলেন, তেমনি আমার মাথায়ও ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। দিদির পর আবার একটি মেয়ে জন্ম হয়েছে মার কোলে। তার মধ্যে আবার রং কালো । ফলে প্রচন্ডভাবে মুখ ভার ছিল তাঁর। কিন্তু সঙ্গে ভাই নিয়ে আসায় আমার আদর বেড়ে গেলো । তাও আমায় 'কালিন্দী' বলে ডাকটা ছাড়তেন না। কিন্তু এই কালোকেই সযত্নে কোলে তুলে নিয়েছিলেন । এতোটুকু অবহেলা পাইনি আমি শুধু এই মানুষটির জন্য। আমাকে কেউ কিছু খারাপ বললেই তেড়ে আসতেন । মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষের কত ক্ষমতা । ভালোবেসে কত অপছন্দকেও কাছে টেনে নেওয়া যায়।
পক্ষপাতিত্ব ছিল একটু আমার প্রতি। ছোটোবেলা যেখানেই যেতেন আমাকে নিয়ে যেতেন সন্ধ্যেবেলা। পাড়া বেড়ানো থেকে শুরু করে দূরে আত্মীয় বাড়ি যাওয়া পর্যন্ত সব সময় আমি সঙ্গে থাকতাম । কেউ কিছু বললেই ভাইয়ের কাছে গিয়ে নালিশ দিয়ে দিতাম। এর জন্য ভাইবোনেরা ছোটবেলায় আমাকে দেখতে পারত না । এই যে কালো বলে তোর বিয়ে হবে না --একথা কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করতেন, এতে যে আমার কতটা লাভ হয়েছিল উনি নিজেও জানেন না । চাপা রং নিয়ে দুর্বলতা তো দূরে থাক, আমার কেমন জেদ চেপে গেছিল ছোট থেকে, যে আমি বিয়ে করবো না। "তোকে খাওয়াবে কে" এই প্রশ্নটা করলেই বলতাম, আমি চাকরি করব। এখন নাহয় থাক আমার কথা।
বরং পুরোনো কথায় ফিরে যাই। ঠাম্মার কথানুযায়ী জেনেছিলাম ঠাম্মা সেভেন অব্দি পড়েছিলেন। বাংলা গদ্য এবং পদ্য দুটোই ভালো লিখতেন। একটা অটোগ্রাফ খাতাও ছিল। যেটাতে উনার নিজের এবং পরিচিতিদের পদ্যে লেখা টুকরো কথা লেখা ছিল। জানিনা খাতাটা এখন কোথায় আছে। বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে আসার পর পেয়েছিলেন অন্য এক চিত্র। দাদুরা দুই পক্ষ নিয়ে ছিলেন সাত ভাই। আর ছিলেন দ্বিতীয় পক্ষের অসুস্থ শাশুড়ি। ফলে রান্না থেকে শুরু করে ছোটো ছোটো দেবরদের দেখাশোনার ভার ছিল তার উপর। বাড়ির সবাই খুব কালো ছিলেন । বিয়ের পর ঠাম্মার কাকা চিঠি পাঠিয়ে জানতে চেয়ে ছিলেন ,কেমন লাগছে শ্বশুর বাড়ি । ঠাম্মা চিঠিতে যা লিখেছিলেন --"অনেক বড়ো জমিদার বাড়িতে বিয়ে দিয়েছো কাকা। বড়ো বড়ো ঘর, আসবাবপত্র কোনো কিছুর অভাব নেই । কিন্তু বিধাতা এখানে কালোজিরের বীজ বপন করতে কোনো কার্পণ্য করেননি"। শ্বশুর বাড়ি নিয়ে নিজের কাকাকে লেখা এই ক'টি লাইন এখনও আমাকে খুব ভাবায় । গুরুজনের সাথে কতটা সহজ সম্পর্ক থাকলে আর কতটা রসবোধ থাকলে, কারো গায়ের রং নিয়ে এভাবে লেখা যায়। হ্যাঁ, খুব বেশি সাহিত্যচর্চা করার সুযোগ এ সংসারে এসে পাননি ঠাম্মা । কিন্তু চিঠি লিখতেন সবাইকে। চিঠি লিখতেন দাদুকেও।
দাদু তখন অল্প বয়সের সুন্দরী বউ ছেড়ে ব্যবসার কাজে আইজল । পরে সিলেটে চাকরিতে যোগ দেন। তাও চাকরিসূত্রে দূরে থাকতে হতো । তাই চিঠি লেখা চলত। কিন্তু সিলেটের বাড়িটা গোপন চিঠির জন্য নিরাপদ ছিল না। ঠাম্মা বলতেন, ঘরে ডাকাত ছিল দু- একজন। ডাকবাক্সে চিঠি পড়া মাত্রই উধাও হয়ে যেত। দাদু বিষয়টি আঁচ করতে পেরে নতুন বুদ্ধি বের করলেন । বাংলা অক্ষরের এক নতুন হরফ বানালেন। সেই হরফের সূত্র তৈরি করলেন । প্রসঙ্গত বলে রাখি, দাদু প্রচন্ড মেধাবী ছিলেন । সেই হরফের সূত্রের কাগজটা থাকত ভাইয়ের কাছে । দাদু একবার বাড়ি এসে দিয়ে গেছিলেন লুকিয়ে । এরপর চিঠি আসলেই দেবরদের মধ্যে যিনি বড়ো, তিনি চিঠিটা হাতে নিয়ে অপরিচিত অক্ষর দেখে রেখে দিতেন । ফলে চিঠি পৌঁছে যেত ভাইয়ের শোবার ঘরে। সূত্র খুলে অক্ষরগুলোর অর্থ উদ্ধার করতেন ভাই নীরবে। কয়েকদিন এভাবে চলার পর দেবর ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। এরপর বৌদির ঘরে সূত্রের কাগজটা প্রায় চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লেন বৌদির কাছে। স্বাভাবিকভাবেই ধস্তাধস্তিতে কাগজটা গেল ছিঁড়ে । আজও আপশোস হয় এই ভেবে যে, সেই কাগজটা যদি বাঁচিয়ে রাখা যেত, তবে নিঃসন্দেহে তা এক মেধাবী প্রতিভার স্বাক্ষর হয়ে থাকত।
আপনারা ভাবতে পারেন অপছন্দের বিয়েতেও রসবোধ তো ব্যাপক ছিল। দুজনেই ছিলেন রসিক। কিন্তু কোথাও একটা তার কাটা ছিল । কেননা জ্ঞান হবার পর থেকে ঝগড়াই শুনেছি দুজনের। কখনো ভাইয়ের ঘরোয়া সংস্কার নিয়ে, কখনো পুরনো ইতিহাস ঘেঁটে, কখনো বা ইচ্ছেমতো টাকা না পেলে ঝগড়া করতেন ঠাম্মা। আর একটা জিনিস আমার খুব মজা লাগত।দাদু যেদিন পেনশান আনতে যেতেন, সুন্দর করে গুছিয়ে ধুতি পরে ,লাঠি নিয়ে শহরে যেতেন পেনশন তুলতে । আসার পরই সেখান থেকে কিছু টাকা ভাইয়ের হাতে ণ্ণ দিতেন। আরো কাউকে দেবার থাকলে দিতেন এবং তাঁর একটি ডায়েরিতে সেই খরচ হিসাব টা তুলে রাখতেন। একদিন সেই ডায়েরিটা দেখতে পেয়ে ভাইয়ের যত আপত্তি। তাঁর মতে বউকে টাকা দিলেও বুঝি লিখে রাখতে হয়? এত হিসাব, এত হিসাব । মোদ্দা কথা ছিল, দাদু ছিলেন হিসেবি, ঠাম্মা ছিলেন শৌখিন। আর হিসাবের সাথে তো শৌখিনতার চিরদিনের বিবাদ।
এতটাই শৌখিন ছিলেন নিজে যে, তার বিছানার শিয়রে সারি করে সাজানো থাকতো নানা জিনিস । ও হ্যাঁ,শিয়র বৃত্তান্ত তো বলাই হয়নি । তাতে থাকত নেলপলিশ, লিপস্টিক, টিপের পাতা। এছাড়া থাকতো হরলিক্স, পাউডার দুধ ,বিস্কুট ,চিনি । এসবের প্রয়োজন হলেই যাতে হাতের কাছে সব পাওয়া যায়। নেলপলিশ -লিপস্টিক গুলো নিজে ব্যবহার না করলেও আমরা খুঁজলে যাতে তার কাছে পেতে পারি তারই ব্যবস্থা করে রাখা। আর থাকতো বই। বিশেষভাবে কবিতার বই । মাঝেমাঝে কবিতা পড়ে শোনাতেন, তার অর্থ বুঝিয়ে দিতেন । রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতা তাঁর মুখস্থ ছিল। 'শেষ শিক্ষা' কবিতার গল্প টা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন খুব যত্ন করে। এখনো মনে পড়ে সে সব কথা । টিভিতে বাংলা নাটক দেখতেন খুব আগ্রহ ভরে । ঠিক আটটার সময় আরম্ভ হতো নাটক । আমরাও সঙ্গী হতাম । উনার সঙ্গে দেখা বাংলাদেশের কত ধারাবাহিক এখনো আমার শৈশবের স্মৃতিপটে ভেসে আছে । অনেক চরিত্রের গায়ে ছোটোবেলার ভাবনার গন্ধ লেগে আছে। এতে পড়াশোনার ক্ষতি হতো অনেক সময়। কেননা টিভিটা ছিল মাঝখানের ঘরে । কোয়ার্টারের প্রতিটা ঘরে তার আওয়াজ যেত । কিন্তু কেউ তাকে বাধা দিত না । সময় হলেই চেয়ার নিয়ে তিনি টিভির সামনে বসে যেতেন । আসলে কারো সাহস ছিলনা তাকে বাধা দেয়ার। এমনি প্রতাপ ছিল।
প্রতাপ এর গল্প পরের পর্বে লিখব। তবে তাই বলে পড়াশোনা আমাদের থেমে থাকেনি। কিছুর জন্যেই আসলে কিছু থেমে থাকে না ।নিজের ছন্দে এগিয়ে যায় । তাই জীবন থেকে যা পাওয়ার, সবটুকু শুষে নিতে হয় ।ঠাম্মা আসলে এমনি ছিলেন। জীবনকে উপভোগ করেছেন অকুণ্ঠচিত্তে আজীবন।
পর্ব - ৩
একটি মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর মা-বাবার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কেননা একটি শিশু যখন প্রথম চোখ মেলে তাকায় তখন সবচেয়ে কাছে তার মা-বাবাকে দেখে। বড়ো হওয়ার সাথে সাথে মা-বাবার কথাবার্তা ,কার্যকলাপ তার আদর্শ হয়ে ওঠে । হাজার যৌথ পরিবারে বড় হলেও ,যৌথ পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে সে তার মা-বাবার চোখে দিয়ে দেখে। মা যাকে ভালবাসে, যাকে ঘৃণা করে যাকে হিংসে করে, যাকে অবহেলা করে, ছেলেমেয়েও সেই একই প্রবৃত্তির শিকার হয়।
গত দুটি পর্বে ঠাম্মা সম্পর্কে এত ভালো ভালো কথা বলেছি । কিন্তু একটা মানুষ কখনোই পুরোটা ভালো হতে পারে না । খারাপ ভালো মিলেই মানুষ। আবার বলা যায় ভালো-খারাপ এর বিচার কে করবে? তোমার কাছে যা ভালো আমার কাছে তা খারাপ হতে পারে । আবার উল্টোটাও হতে পারে । এগুলো সবই হচ্ছে আসলে দৃষ্টিভঙ্গি । রবীন্দ্রনাথ তো নিজেই বলেছেন ,তুমি নও আমার মত ,আমি নই তোমার মত । তাই বলে কি ঝগড়া করে মরতে হবে ? এই সত্যটিই আসলে বুঝতে দেরি হয়ে যায় আমাদের।
আমরা আসলে ছোটো থেকে তাই দেখেছি, যা আমাদের দেখানো হয়েছে বলা হয়েছে । বাবার কোয়ার্টারে আমরা ভাই- বোন, দাদু ঠাম্মা, ছাড়াও ছিলেন আমার কাকু। তিন মাসতুতো বড়ো ভাই বোন। তারা এখানে থেকে পড়াশোনা করত। এছাড়াও মাঝে মাঝেই অনেকে আসতেন। পিসি আসতেন সপ্তাহান্তে। চাকরির ছুটিতে। আমাদের মামা আসতেন কাজের ফাঁকে ফাঁকে। এতসব সদস্য সদস্যার মধ্যে ঠাম্মা ছিলেন রানীর মতো। পুরো যেন জমিদার গিন্নি। সারাদিন যে কত শব্দ খরচ করতেন, তার ইয়ত্তা নেই । আড়ালে সবাই 'বাচাল' বললেও তাঁর তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না । এতটাই আত্মবিশ্বাস ছিল, কেউ খারাপ বললেও তার কিছু যেতো আসতো না। কথাটা গভীর উপলব্ধি থেকে বললাম ,কেননা আজও আমায় কেউ খারাপ বললে ,আমার আত্মবিশ্বাস টলে যায়। আমি তখন নিজের বিচার করতে বসে যাই, সত্যিই কি আমি এত খারাপ ? উল্টোদিকে দাদু ছিলেন নীরব ,শীতল একটি মানুষ । আর এজন্যই ভাইয়ের গলা সপ্তমে চড়ে থাকত সবসময় । কেননা এই নীরবতা তিনি সহ্য করতে পারতেন না।
হ্যাঁ, প্রতাপ ছিল ঠাম্মার। প্রচন্ড প্রতাপ। ঘরে প্রতিটি সিদ্ধান্তে তার মতামত জরুরি ছিল। আর ছিলেন স্বাধীনচেতা । স্বামীকে জয় করে নিয়েছে যে নারী ,তার আর কাকেই বা ভয় ?যখন যেখানে ইচ্ছে স্বামীকে ছাড়া একা একা চলে যেতেন । কোলকাতা গিয়েছিলেন একবার একা । বাংলাদেশেও গেছিলেন পুরুষসঙ্গী ছাড়াই । ভয় ছিল না মোটেই । বাইরের জগতকে যে নির্ভয়ে পার করতে পেরেছে, ঘর তার কাছে কোন ছার! যেমন ছিল নিজের বেশভূষা, তেমন ছিল ঘরের আসবাবপত্র। পুরোনো ঢেউ খেলানো পালঙ্ক। তিনটি ট্রাংকের উপর বসানো একটি ড্রেসিং টেবিল । ভারি অদ্ভুত ছিল সেই ড্রেসিং টেবিলটি। ছোট্ট একটি আয়না, আর তার সাথে একটি ড্রয়ার। সেটাই বসানো থাকতো ওই তিনটি ট্রাঙ্কের ওপর । আর তার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি সিঁদূর পরতেন। তারপর যেতেন ঠাকুর ঘরে। ঠাকুর ঘর সাজানো ছিল সরস্বতী, নারায়ণ,মা লক্ষ্মী আর রামকৃষ্ণ সারদা ,স্বামীজীর আসনে। মিশন এর দিক্ষিত ঠাম্মা প্রচন্ড ভক্তিমতী ছিলেন। ঠাকুরের সংসার পুরো তার নিজের ছিল। সেখানে কারো প্রবেশ নেই। আমরা অপেক্ষা করে থাকতাম, তার হাতের মাখা বৃহস্পতিবারের লক্ষীর প্রসাদের জন্য । কী সুস্বাদু ছিল । একটু দিলে বলতাম, আর একটু দাও ! এত কৃপণ কেন তুমি ? এছাড়া খুব ভালো সেলাই করতে পারতেন ঠাম্মা। একটা হাত মেশিন ছিল ,দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রায়ই কী কী সেলাই করতে দেখতাম । সোয়েটার বানাতেন বিছানায় শুয়ে শুয়ে । খুব সুন্দর লেস লাগিয়ে পাখা তৈরি করতে পারতেন। তার কাছেই প্রথম শিখেছিলাম হেম সেলাই ,বোতাম সেলাই কাকে বলে ? এগুলো নাকি তাদের স্কুলে শেখাতো। এ সমস্ত কিছু মিলে আমার মনে হতো, ঠাম্মার এই সংসার তার পুরোনো সিলেটের জমিদার বাড়ির এক ছোট্ট সংস্করণ । তাঁর একটি খুব ভালো সংরক্ষণের অভ্যাস ছিল । যা আমাকে আকৃষ্ট করত । একটি কালো পাতার অ্যালবাম ছিল, এখনো মনে পড়ে ,তাতে কোনো প্লাস্টিক ছিল না । শুধু আঠা দিয়ে ছবিগুলো লাগিয়ে দিতে হতো । তাতে ঠাম্মার মা বাবা ,কাকা কাকি থেকে শুরু করে সবার ছবি ছিল । আমি সময় পেলেই সেটা খুলে সবার পরিচয় জিজ্ঞেস করতাম বলে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল সবার মুখ। উনার বাবার বাড়ির সবাই দূরে দূরে থাকতেন। একমাত্র দাদার সংসার ছিল কোলকাতায় । তাই আচার বানিয়ে একটি শিশিতে আলাদা করে রাখতেন । কোনোদিন কোলকাতা গেলে ওদের জন্য নিয়ে যাবেন । আর আমরা ইচ্ছে করে এটাকেই বগলদাবা করে উনাকে খালি ক্ষ্যাপাতাম । তখন কি আর বুঝতাম ওই আচারের কৌটোটাই ছিল তার একটুকরো অতীত।
তো যে কথা বলছিলাম ,প্রতাপ এবং আধিপত্য এতটাই ছিল যে রান্নাঘর থেকে অনেক আগেই ছুটি নেওয়া সত্ত্বেও ভাঁড়ার-ঘর পুরোটা উনার হাতে ছিল। কোয়ার্টারে মাসের বাজার করা হলে একটা বড় কার্টুন আসতো। এটা এনে ঠাম্মার ঘরে রাখা হতো। উনি নিজের হাতে সমস্ত গোছাতেন। তেল-মশলা সমস্ত কিছু নিজের জিম্মায় রাখতেন। রান্নাঘরে যে-ই রান্না করুক, তেল মশলা শেষ হলে কৌটো নিয়ে ভাইয়ের দরজায় দাঁড়াতে হতো। তারপর ঠিক জমিদার গিন্নির কায়দায় ঠাম্মা উঠে এসে আলগা থেকে তেল মশলা ঢেলে দিতেন। খাবার তৈরি হলে সবার আগে ডাক পড়তো ঠাম্মার। ঠাম্মা খেলে তবেই দাদু খেতেন। এটা প্রায় দৈনন্দিন চিত্র ছিল ।
মায়ের সাথে ঝগড়া হতো নিরন্তর। কথা কাটাকাটিও হত । ঝগড়া করতেন, কিন্তু কোনোদিন মন থেকে আঘাত করেননি মাকে। আমার মা ছোটোবেলা বাবা হারিয়েছেন। আর উনার মা থাকতেন মাসির কাছে অনেক দূরে। ফলে প্রায় একা একাই আত্মীয় বাড়িতে থেকে সংগ্রাম করে বড়ো হয়েছেন মা। তাই আমাদের সেঅর্থে কোনো মামার বাড়ি ছিল না । মাসির বাড়িকেই আমরা মামাবাড়ি ভাবতাম। কিন্তু ছেলের শ্বশুরবাড়ি সে অর্থে ছিলোনা বলে কোনোদিন আক্ষেপ শুনিনি ঠাম্মার মুখে। বরং আমার মামা -মামি কিংবা মাসিরা বাড়িতে এলে নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ দিয়েছেন। কর্তব্য করেছেন। মাসির বাড়ির অনুষ্ঠানে আন্তরিকভাবে উপস্থিত থেকেছেন। আমার চাকুরিরতা মায়ের এ বাড়িতে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতায় উনার শ্বশুর-শাশুড়ি কোনোদিন বাধা দেননি। যে স্বাধীনতা আজ এই শতাব্দীতে আমরা আমাদের শ্বশুরবাড়ি থেকেও আশা করতে পারি না ।
ছোটোবেলা থেকে ঠাকুর ভক্তি ,পাঁচালি পড়া, পুজো করা -এছাড়া আরও যা যা সংস্কার শিক্ষা সব তাঁর কাছেই শিখেছিলাম বোধ করি। সংস্কার মনা ছিলেন কিন্তু কট্টর ছিলেন না। সংসার ভালোবাসতেন, কিন্তু সংসারের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন না । এই বৈপরীত্যটাই আজো আমাকে মুগ্ধ করে।
আর একটা মজার কথা মনে পড়ছে,একবার মা'র এক পরিচিত ভদ্রলোক এসেছিলেন এক কাজের সূত্রে । তিনি এসে ঘরে জুতো নিয়ে ঢুকেছিলেন এবং সব ঘরে ঢুকে সবার সাথে দেখা করে গেছিলেন এবং আরেকদিন কাজের সূত্রে আসার কথা জানিয়েছিলেন। উনি চলে যাবার পরই ভাই এই জুতো নিয়ে ঢোকার জন্যে প্রচন্ড ক্ষেপে গেলেন। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগলেন দাদু ,সবাই তো তোমার মতো নয় ,ঢুকলে কি হয়েছে ?তো ঠাম্মা ভাবলেন, উনাকে তো সরাসরি বলা যাবেনা । তাই একটি কাগজে 'জুতো নিয়ে প্রবেশ নিষেধ' লিখে নিজের ঘরের দরজায় আটকে দিয়ে ছিলেন। অনেকে তাকে 'বেশি কথা বলা ঠাম্মা' বলে চিনত। হ্যাঁ,কথা অনেক বেশি বলতেন। কিন্তু তাতে একফোঁটাও পরনিন্দা পরচর্চা ছিল না। কারো ক্ষতি করার উদ্দেশ্য ছিল না। আমরা কারো সম্পর্কে খারাপ কথা বললে উনি কেটে দিতেন । আগের পৃথিবীটা বোধহয় এমনটাই ছিল। আগের মানুষগুলোও।
উনার আড়ালে উনাকে অনেকে অনেক কথা বললেও, উনি এতটুকু কুণ্ঠিত হতেন না। বলতেন ,যে বা যারা বলবে পাপ তো তাদের হবে। আমি প্রায় সময় বলতাম এত কথা বলো কেন? সব জায়গায় তোমাকে যেতে হবে কেন? ওরা খারাপ পায়। তাতে উনার কিছু হতো না। উনার যেখানে যাওয়ার ঠিক যেতেন। যেটুকু বলার সেটুকুই বলতেন । সমস্ত প্রতাপের আড়ালে একটা বড়ো হৃদয় ছিল ঠাম্মার । যে হৃদয় দরিদ্রের জন্য কাঁদত। ঘরে তখন প্রায়ই ভিক্ষুক আসত। এখন আর তা দেখা যায় না। ভিক্ষুক এলে এক মুঠো চাল দিতে হতো । আর সেটা দিতেই আমাদের যত আলসেমি ছিল। কখনো ইচ্ছে করে বিছানা থেকে নড়তাম না। আর এজন্য কতবার গালি খেয়েছি ভাইয়ের কাছে। উনি নিজে চালের সাথে তখন উনার সংগ্রহের খাবার যা আছে তাও দিয়ে দিতেন। কোনো সময় নিত্য পরার কাপড় দিয়ে দিতেন রৌদ্র থেকে তুলে এনে। খেটে খাওয়া মানুষ কিংবা সর্বহারার প্রতি যে মমত্ব-- এর শিক্ষাও আমরা পেয়েছি ঠাম্মার কাছ থেকে ..। কানের কাছে শুধু বলতেই থাকতেন ,এদেরকে কখনো ঠকিও না । যা আছে তোমার তার ভাগ দিও। আর তাই ভিক্ষুকরা গদগদ হয়ে তাকে 'মা'ডেকে প্রনাম করতে দেখেছি ।
তো শুরুর দিকে যে কথা বলছিলাম, পৃথিবীতে আমরা যে কোনো মানুষকে আসলে মায়ের চোখ দিয়ে দেখি । মা আমাদের এতোটাই আপন, মায়ের চোখের বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে দেখা খুব কম মানুষেরই হয়ে ওঠে । এই যে আজ ঠাম্মার চরিত্রটিকে এভাবে তুলে আনছি ,তার কতটুকুই বা আমার নিজের দেখা ? আসলে যা আমাকে দেখানো হয়েছে, তাই লিখছি। ঠাম্মার সাথে ঝগড়া হতো মায়ের। নানা বিষয়ে ঝগড়া। সাধারণত মায়ের সাথে বাবা যদি ঝগড়া করেন, তখন মাঝে মাঝে বাবাও অপ্রিয় হয়ে যান। 'মা' বস্তুটি এমনই। কিন্তু কেন জানিনা ঠাম্মা কোনোদিন আমাদের কাছে অন্তত এই কারণে অপ্রিয় হননি। কেননা মা তার ঝগড়াটা ওয়ান ইস্টু ওয়ান রেখেছিলেন। তার শেকড় বাকড়ে ছড়িয়ে দেননি । কানের কাছে বলতে বলতে যে কথাটা মর্মে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তা হলো ,ঠাম্মার সাথে আমার ঝগড়া হতেই পারে। আমরা দুটো বাড়ির দুটো মানুষ । কিন্তু তোমাদের ঠাম্মা তোমাদেরই। তোমাদের তাতে কি ?? যা কিছু অসুন্দর ছিল ঠাম্মার ,আমাদের কাছে তার প্রকাশ হয়নি। একটু বড়ো হওয়ার পর তাকে নিয়ে কোনো আলোচনা করলেই ,মা দুই হাত তুলে তা থামিয়ে দিতেন । আর সঙ্গে ঠাম্মার এমন কিছু ইতিবাচক দিক যোগ করে দিতেন ,যে সুন্দরের চাপে অসুন্দর মারা পরত অক্লেশে। আর এভাবেই আসলে আমাদের ছোটবেলাটা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মফস্বলের বাড়িতে থাকায় আজীবন বাবা-মা থেকে দূরে থেকে আমাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে । বাবা-মার সংস্পর্শ ছাড়া যে পৃথিবী-- সেই পৃথিবীও অনেক কিছু শিখিয়েছে আমাদের। ভালো খারাপ দুটোই ।
যখন আমার চৌদ্দ বছর বয়স আর দিদির ষোলো, তখন ঠাম্মা চলে গেলেন করিমগঞ্জ। এতদিন পর আমাদের একটি বাড়ি হলো । দাদু ঠাম্মার শখ পূরণ হলো।
তো কাকুর সাথে দুজনেই করিমগঞ্জে নতুন বাড়িতে গিয়ে উঠলেন । এক অন্য শহরে নিয়ে গেলেন তার সংসারের সমস্ত পুরনো সংস্করণ। কিন্তু আমার ভুবনটা যেন খালি হয়ে গেল । বাড়ি না থাকলেও ছুটিতে বাড়ি আসলে এই একটা বিছানাই ছিল যেটাতে আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাতাম । এরপর ধীরে ধীরে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়েছিল অন্যদের সাথে। এরপর অবশ্য দু- এক বছরের মধ্যেই ঠাম্মা আবার ফিরে এসেছিলেন আমাদের কাছে ,প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে। নিজেই ফিরতে চেয়েছিলেন পুরোনো জায়গায়। আসলে বাগানের পরিবেশটাই ছিল এমন। যার আলো-হাওয়া রোদ মানুষকে তার কাছে টেনে নেয় । এ কথা ভাবলে আজও মুগ্ধ হই যে, কত অনায়াসে এই সংসার আঁকড়ে থাকা মানুষটা বাড়ি -ঘর -সংসারের মায়া ছেড়ে এমনকি নিজের স্বামীকে ছেড়ে আবার আমাদের কাছে ফিরে এসেছিলেন । আসলে তিনি সেটাই করতেন জীবনে, যেটা তার মন তাকে করতে বলতো।।
দাদু অবশ্য ঠাম্মা কে ছেড়ে থাকেননি। এক বছর পর ঠিক চলে এসেছিলেন । এরপর দাদু বেশিদিন বাঁচেন নি । শঙ্খ সিঁদুর গায়ে মৃত্যুর খুব শখ ছিল ঠাম্মার। সে শখ পূরণ হয়নি। 'আপনার মতো যাতে সাদা চুলে সিঁদুর দিতে পারি' ,এই আশীর্বাদ চাইত অনেকে তার কাছে। এখনো মনে পড়ে, কেউ হাত দেখতে আসলে জিজ্ঞেস করতেন,, আমি আগে মরবো কিনা সেটা বলো। দাদুর মৃত্যুর পর প্রায় ছয় বছর বেঁচে ছিলেন ঠাম্মা। তখন প্রায় চোখে দেখতে পেতেন না । কিন্তু রেডিও শোনা আর আন্দাজ করে সেলাই করা, পাখা বানানো এসব বন্ধ হয়নি । এই সময়টা ভাইকে খুব বেশি পাই নি । কেননা শিলচরে কলেজ ইউনিভার্সিটি'তে পড়ার পর্ব চলছে তখন । ফলে মা আর বাবাই থাকতেন উনার সাথে। বন্ধে বাড়ি গেলে তবেই তার সঙ্গ পেতাম। কিন্তু তখন তার আগের প্রতাপ, মেজাজ কিছুই ছিল না। তবু কোনো কিছুর সাথে আপোষ করেননি । কোনোদিন মাথা নোয়াননি বলে কেউ কেউ বলতে পারেন, অহংকারী, তেজি,স্বার্থপর । কিন্তু আজকের তারিখে দাঁড়িয়ে এরকম একটি নারীকে আমি স্যালুট করি । স্যালুট করি তার জীবনে মাথা উঁচু করে বাঁচার লড়াই কে।
পর্ব - ৪( অন্তিম পর্ব)
(আজ আমার স্মৃতিচারণ পর্বের অন্তিম পর্ব লিখতে চলেছি । গত তিনটি পর্বে যাঁরা যাঁরা এই লেখা মন দিয়ে পড়েছেন এবং আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন, লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা । এছাড়া কোনো মন্তব্য ছাড়াই যাঁরা আমার লেখা পড়েছেন এবং নীরবে উপলব্ধি করেছেন তাঁদের প্রতিও রইল আমার অসীম কৃতজ্ঞতা ।)
তখন স্মার্ট ফোন ছিলনা। ছিলনা ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপও। তাই বলে কি জনসংযোগ থেমেছিল? মানুষ তো জীবনে জীবন যোগ করেই বেঁচে থাকে পৃথিবীতে। আর এই সত্যটা ঠাম্মাকে পালন করতে দেখেছি আজীবন। তখনকার দিনের এক সংসারী গৃহবধূর এতটাই যে জনসংযোগ ছিল, চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবেন না । মিশন--মানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের যে জনসংযোগ তা বরং বাদই দিলাম । এছাড়াও যেখানেই যেতেন ,সেখানেই পাড়ার মানুষ থেকে শুরু করে সবার সাথে তাঁর একটা আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠত। জনপ্রিয় হয়ে ওঠার গুণ ছিল তাঁর অপরিসীম ।
শরীরে অসুস্থতা তেমন ছিল না কোনদিনই। শুধুমাত্র হাঁপানির সমস্যা ছিল । তাই অনেক আগেই রান্নাঘরের কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ঠাকুরের ভোগ নিজেই রান্না করতেন। পাঁচ সন্তানের মা আমার ঠাম্মা। দুজন ছেলে, তিনজন মেয়ে । কিন্তু কোনোদিনই তাঁকে মনে হয়নি টিপিক্যাল 'মা' কিংবা টিপিক্যাল 'শাশুড়ি' কিংবা টিপিক্যাল 'গৃহবধূ'। এই টিপিক্যাল ব্যাপারটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে যারা তারাই তো আসলে বিখ্যাত হন। আমাদের টিপিক্যাল সমাজতন্ত্র আসলে আমাদের এইসব বানিয়ে রাখতে চায়। ঠাম্মাকে কোনোদিনও দেখিনি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছেলে কী খাবে, ছেলে খেয়ে গেল কিনা --তার তদারকি করতে।যা টিপিক্যাল শাশুড়িরা করে থাকেন। ঠাম্মাকে দেখিনি বাবা বা মা'র ঘরে আসতে দেরি হলে চিন্তান্বিত হতে। বরং দাদুর চিন্তায় তিনি সাহস দিতেন। মা'র অফিস থেকে আসতে দেরি হলে দাদু উঠোনের কোণায় থাকা কাঁঠাল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতেন । যেখান থেকে টিলার নিচের রাস্তা দেখা যায় । ঠাম্মা হয়তো তখন ঘরে শুয়ে বই পড়ছেন । জীবন নিয়ে তাঁর ভয় ,শঙ্কা ,দুশ্চিন্তা কিছু ছিল না । 'মা' হিসেবে বুঝি একটু কঠোরও ছিলেন । আর সমীক্ষায় দেখা গেছে ,কঠোর মায়েদের সন্তান সাহসী, আত্মনির্ভর আর লড়াকু হয়। আর আক্ষরিক অর্থেই তাঁর সন্তানরা আসলে তাই হয়েছেন।
আমার বাবা এখনো কোনো কাজের জন্য আমার মা'র ওপর নির্ভর করেন না । মাত্র ছয় বছর বয়স থেকেই বাবা রান্না করেছেন। বড়োপিসির জন্মের সময় ঠাম্মার আঁতুড়ঘরের রান্না বাবা নিজে করেছেন । সন্তানদের প্রতি কখনো কখনো কঠোর হয়েছেন ঠাম্মা । কিন্তু কোথাও না কোথাও এই কঠোরতা তাঁর সন্তানদের জীবনে শক্তি যুগিয়েছে । মনে পড়ে আমার মাসতুতো দিদি সন্তানসম্ভবা হলে ইনল্যান্ড লেটার এ আমার ঠাম্মা কে লিখেছিল, 'আশীর্বাদ করবেন যেন আপনার মত সুপুত্র জন্ম দিতে পারি'। এটাই তো একজন মায়ের পুরস্কার । আমি মনে করি আমাদের ঘরে ঘরে এমন মা'ই যেন জন্মায়। আজ মেয়েরা যদি বাইরের জগতটা কে জয় করে নিয়েছে, ছেলেরা কেন ঘরের জগতকে জয় করবে না। কোনো নারী যদি তার স্বামীর শ্রমের ভাগ নিয়ে উপার্জন করতে পারে, সেই স্বামী কেন তার স্ত্রীর ঘরোয়া শ্রমের ভাগ নেবে না ? সমাজ আসলে দাবি করে, যতই তুমি উপার্জন করো নারী, স্বামীর সেবা করা, রান্না করা ,বাসন মাজা তোমাকেই করতে হবে। যতই তুমি শিক্ষিত হও,গুণী হও, 'মা' হবার পর তোমার সব ত্যাগ শুধু সন্তানের জন্য থাকবে । নইলে বলা হবে, তুমি ভালো মা হতে পারোনি। 'মা','মেয়ে', 'স্ত্রী' এই শব্দগুলোর ইমেজ তো আমাদের সমাজ বানিয়েছে । একটি মেয়ের বিয়েতে কন্যা বিদায়ের মুহূর্তে মেয়ের চোখে জল না থাকলে যেমন সমাজ অবাক হয়, তেমনি অবাক হয়, সন্তানের ঘরে ফেরার চিন্তায় তার মা উৎকণ্ঠিত না হলে । কিংবা স্ত্রী তার স্বামীকে খাবার তৈরি করে না দিলে, তার প্রতিটি কাজের সহায় না হলে । মানে তার উল্টোটা ঘটলে সমাজ তেমনি অবাক হয় । আমাদের ঠাম্মা এইসব প্রটোকল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন । তাঁর জীবনের প্রতিটি সময় ,ঠিক তাঁর নিজের ছিল । তিনি বিশেষ কারো জন্য বাঁচেন নি। আবার তিনি জনসাধারণের জন্য বেঁচেছেন । এরাই তো আসলে জাত শিল্পী। 'ঘরের খেয়ে পরের মোষ তাড়ানো' যাকে বলে আর কি !
অন্তিম পর্ব মানে শেষ পর্ব । আর শেষ মানেই মৃত্যু । আবার রবীন্দ্রনাথ বলেছেন 'শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলিবে।' এই কথাটা সত্য বলেই তো এতদিন পর লিখতে বসেছি এইসব পুরনো কথকতা । তবুও দৈহিক তো একটা মৃত্যু থাকে। এ জগত থেকে সবাই একদিন বিদায় নেবো । ঠাম্মাও জানতেন ,এই অপূর্ব সুন্দর ভোগযোগ্য পৃথিবী থেকে তাঁকে একদিন বিদায় নিতে হবে । আর তার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন প্রায় ষাট্ বছর বয়স থেকেই । মৃত্যু হয়েছিল আশি বছর বয়সে। মৃত্যু নিয়ে যে মানুষের এতটা ফ্যান্টাসি থাকতে পারে, তা আমি আজ পর্যন্ত কারো মধ্যে দেখিনি।
আমরা সবাই জানি, একদিন আমরা সবাই চলে যাবো। চলে গেলে তো আর কেউ কখনও মনে রাখবে না । কিন্তু ঠাম্মা হয়তো মৃত্যুটাকে একটু অন্যভাবেই দেখতেন। জীবনের পাঠপর্বে অনেক কবিদের কবিতায় দেখেছি ,মৃত্যুচেতনা। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং অনেকেই মৃত্যুকে নিয়ে ভেবেছেন অনেক। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যেতে পারি ,কিন্তু কেন যাবো' এই লাইনটা আমাকে অনেক দিন অনেক ভাবে ভাবিয়েছে। এ যেন মৃত্যুর প্রতি এক অমোঘ অভিমান। ঠিক এমনটাই মনে হতো ঠাম্মার সাথে কথা বললে তার জীবনের শেষটায়। মৃত্যুর পরও আরো অনেক অনেক দিন যাতে তিনি সবার হৃদয়ে বেঁচে থাকতে পারেন, তার যে কী আপ্রাণ চেষ্টা ছিল, তা বলে শেষ করা যাবে না । পাড়ার কারো জন্মদিন হলে কিংবা বিয়ে অন্নপ্রাশন । ঠাম্মার দেওয়া উপহারের উপর থাকতো একটি চিরকূট। তাতে যে আশীর্বাদবাণী লিখে দিতেন, তাতে অবশ্যই লেখা থাকত 'আজি হতে শতবর্ষ পরে ,কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি' গোছের কিছু লেখা। পাশের কোয়ার্টারের সবাই যারা তাকে দিম্মা, ঠাম্মা কিংবা ভাই বলত, তারা সবাই বলতে পারবে একটুকরো হলেও ভাইয়ের স্মৃতিচিহ্ন তাদের কাছে আছে। নিজের ব্যবহৃত জিনিস অনেককে দান করেছেন, হাতের তৈরি জিনিসও বানিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া মৃত্যুর আগে সারদাসংঘে কিছু বাসনপত্র দিয়েছিলেন। যাতে ঠাকুরের কাজে তা অনেকদিন ব্যবহৃত হয়। অন্ধ অবস্থায় কলম দিয়ে আমার ডায়েরিতে অাঁচড় কেটেছিলেন কিছু পঙক্তি। কোনো একদিন দেখাবো আপনাদের ।
আমার ছোটোবেলা থেকেই চোখের সমস্যা ছিল পাওয়ারের। ঠাম্মা প্রায়ই বলতেন আমি মরে গেলে তোকে আমার চোখগুলো দিয়ে যাবো । তুই আমার চোখ দিয়ে দেখবি । আমি তখন বলতাম, চাইনা তোমার ওই নীল চোখ। শেষ বয়সে এই শখের চোখ দিয়ে অনেকদিন পৃথিবীটাকে আর দেখতে পাননি ঠাম্মা। এই কথাটা ভাবলে আজো খুব কষ্ট হয়। মৃত্যু যে কত পরিকল্পিত হতে পারে, ঠাম্মার কথা মনে পড়লে আজও অনুভব করতে পারি। মৃত্যুর আগে যা যা নিজের ছিল সবাইকে ভাগ করে দিয়েছিলেন । মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ কীভাবে হবে, স্নানটা যেন মাটিতে বসিয়ে না হয় ,চেয়ারে বসিয়ে করানো হয়। এটুকু পর্যন্ত বলে গেছিলেন। মানে অনেক দিন ধরেই এই কথাগুলো আওড়াতেন আরকি কানের কাছে। ঠাকুর ঘরের সামনে গঙ্গাজল, রুপোর কাঠি ,সোনার কাঠি, শবযাত্রায় যা যা লাগে আর কি ! উঠতে-বসতে সেগুলো বারবার মনে করিয়ে দিতেন । আর বলতেন কোনো কিছুর জন্য যেন বিশৃঙ্খলা না হয় । সব তৈরি আছে। প্রাণ যাওয়ার সময় নিজের হাতের আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করেছিলেন ওই গঙ্গাজলের শিশির দিকে। আর সেটাই গলায় ঢালার পরমুহূর্তেই মুক্তি পেয়েছিলেন ইহজগত থেকে ।
ভালো না লাগার বিষয় একটাই । ঠাম্মার এই চরম আকাঙ্খিত মৃত্যুমুহূর্তে আমরা নাতি-নাতনিরা কেউ পাশে ছিলাম না । শুধু মা-বাবার কোলেই প্রাণ গেছিল ঠাম্মার। দুর্গাপূজার অষ্টমী ছিল। ধোয়া বিছানায়, ধোয়া কাপড় পড়ে অষ্টমীর দুপুরে অনন্তধামে পাড়ি দিয়েছিলেন ঠাম্মা। সে'বার শিলচরের অর্ধেক পুজো দেখে আমরা নবমীতে বাড়ি ফিরবো, এটাই কথা ছিল । অষ্টমীর দুপুরে খবর পেয়েই বাড়ি ফিরে ঠাম্মাকে আর পাইনি । শুনেছি একজন জ্যোতিষী বলেছিলেন তোমাদের ঠাম্মা আশি বছর বয়সে অষ্টমী তিথিতে পরলোকে পাড়ি দেওয়ায় তার স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটবে। স্বর্গ-নরক ,সত্য মিথ্যা জানি না। ঠাম্মা যেখানেই থাকুন শান্তিতে থাকুন । মৃত্যুর পরেও আরো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার তাঁর প্রবল যে আকাঙ্ক্ষা তা অবশ্যই সফল হবে আমাদের স্মরণে, আমাদের স্মৃতিসত্তায়।
ঠাম্মার মৃত্যুর পর তার শাস্ত্রসম্মত পারলৌকিক ক্রিয়া ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল। এত লোক এসেছিল খবর মাত্র পেয়ে তা বলার নয় । চোখে কোনোদিন জল দেখিনি, আদর করে কাউকে জড়িয়ে ধরতেও দেখিনি । কিন্তু কিসের গুণে এত ভালোবাসা মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছিলেন, ঈশ্বর জানেন। কাকুর সাহায্যে আমরা ভাইয়ের স্মৃতিতে একটা দেয়াল পত্রিকা সাজিয়েছিলাম শ্রাদ্ধের দিন। তাতে কিছু লেখা ,কিছু ছবি আটকে দিয়েছিলাম । সব মিলিয়ে খুব সুস্ঠুভাবে দিনটি আয়োজিত হয়েছিল। কিন্তু সব কোলাহল ,সব আয়োজন এর মাঝখানে একটি থাকে নীরব শ্রদ্ধাঞ্জলি । আর এটিই আমার মন কেড়েছিল। এক ভদ্রলোক রামকৃষ্ণ মিশনের পরিচালন সমিতির সাথে যুক্ত ছিলেন। পেশায় তিনি কলেজের অধ্যাপকও ছিলেন। ঠাম্মা মিশনের নিয়মিত ভক্ত থাকায়, এই ভদ্রলোক ঠাম্মার বিশেষ পরিচিত ছিলেন। ভদ্রলোক ঠাম্মাকে 'মাসিমা' বলে ডাকতেন । অনেক সময় মিশনের কোনো সূচী জানতে গিয়ে, ঠাম্মা ভদ্রলোকের সাথে ঠাকুরের গল্প জুড়ে দিতেন। ভদ্রলোক তখন উনার একটু কাজ আছে, এই বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতেন। কিন্তু ঠাম্মা তাও কিছু জানতে হলে উনার কাছেই যেতেন । শ্রাদ্ধের দিন প্রায় শেষ বেলায় এই ভদ্রলোক এসেছিলেন আমাদের বাড়ি । না, কোনো আহার গ্রহণ করেননি । কারো সাথে বিশেষ কথা বলেননি। শুধু কিছু সাদা ফুল ,আর একটি একহাত লম্বা মোটা ধূপকাঠি ঠাম্মার ছবির সামনে জ্বালিয়ে দিয়ে প্রণাম করে চলে গেছিলেন । এরকম ধূপকাঠি আমি তখন আগে কোনোদিন দেখিনি । অনেকক্ষণ জ্বলেছিল সেই ধূপকাঠি । আমিও দেখছিলাম কতক্ষন জ্বলে ধূপটি। তোমার গুণে তুমি নিজেই অনন্য ছিলে ভাই। ওই ধূপটির মতো আরো অনেক অনেকদিন তুমি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে। বেঁচে থাকবে আমাদের জীবন যাপনের প্রতিটি পর্বে।
(জন্ম ১৯২৭ - মৃত্যু ২০০৭)
সমাপ্ত
Wow eta valo korechis....
উত্তরমুছুনকে বলছেন আসছে নাযে । কে বলছো একটু যদি বলো।
উত্তরমুছুন