বাড়ি তো সেই একটাই

 #বাড়ি তো সেই একটাই#


ক্লাস টু থেকে বাড়ির বাইরে আরেকটি বাড়ি হয়েছিল আমাদের । আমাদের মানে আমাদের পাঁচ ভাই বোনের। কোনটাকে বাড়ি বলে কোনটাকে বাসা বলে বুঝিনি তখনও। অনেক পরে বুঝেছি, কোনোটাই আসলে বাড়ি ছিলনা। তবুও চাবাগানের কোয়ার্টার টা যেন বাড়িই ছিল। অনেক বছরের সাধে- আহ্লাদে, স্বপ্নে-দীর্ঘশ্বাসে হলদেটে হয়ে যাওয়া বাড়ি। সজনে গাছ, পেয়ারা গাছ, বেল গাছ, আম-কাঁঠাল গাছের ছায়ায় বিশ্বস্ত একটি নিশ্চিন্দিপুর। শান্তি ছিল, আনন্দ ছিল। ছিলেন পরিজন।  তবুও সব ছেড়ে পাড়ি দিতে হলো এক বড় আকাশের খোঁজে। 

          ক্লাস টুর নতুন স্কুল। চাবাগানের স্কুল থেকে শহরের এল. পি স্কুলে ভর্তি। পাঁচ কিলোমিটার রোজ আসা যাওয়া সম্ভব নয়। তাই মা অফিসে কোয়ার্টার এ্যাপ্লাই করলেন। শহরে আর একটি কোয়ার্টার হলো, ভাই বোন আর মায়ের জন্য। কিন্তু হলে কী হবে। শনি রবি হলেই ব্যাগ গুছিয়ে, চাবাগানের পথ ধরে যাওয়া কোনো এক না দেখা মফস্বলের নাকওয়ালা বাসে উঠে বসতাম সবাই। দাদু ঠাকুমা পথ চেয়ে থাকতেন কখন পৌছুবো। বাস থেকে নেমেই হ্যান্ডিম্যানের হাতে আট আনা পয়সা গুজে দিয়ে সোজা বাড়ির পথ। 

       নামে শহরে কোয়ার্টার একটা ছিল। আসলে বেশিরভাগ সময়টাই থাকতাম বাগানে। স্কুল, প্রাইভেট টিউশন চালাতে হত বাসে করে আসা যাওয়া করে কিংবা রিকশায়।পরে সাইকেলে। তখনো আর কোনো মাধ্যম ছিলনা। গাড়ি স্ট্রাইক হলে বাদ পড়ে যেত স্কুল। বৃষ্টির কাদায় বাস ফেঁসে গেলে হেটে গিয়েও স্কুল ধরতে হতো। স্কুলে -টিউশনে দেরি হলে কেউ কিছু বলতেন না। সবাই জানতেন এরা বহিরাগত। এদেরকে সুযোগ দেওয়া উচিত, সুযোগ দিতে হয়। 

    ক্লাস টু থেকে টেন অব্দি হাইলাকান্দি শহরে পড়াশোনা করে মেট্রিক পাশ হলো। সবাই জানলো, মফস্বল থেকে এসে এই কতগুলো ছেলে মেয়ে মেধা আর পরিশ্রমের জোরে ভালো রেজাল্ট করলো। এরা এই শহরের কেউ নয়। পড়াশোনার সূত্রে এসেছিল। দীর্ঘ বছর পর হাইলাকান্দির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সামজিক মাধ্যমে একটি মন্তব্য করায় এক বান্ধবীর কাছে শুনতে হয়েছিল, 'তুই তো শহরে থাকতিস না(শহরের কেউ নোস), তাই কিছু জানিস না। "

          হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে। কোনো কোনো খড়কুটোর ভাসাভাসি আজীবন ধরে চলে। আমাদেরও থামেনি। হাইলাকান্দি ছেড়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিলচর শহরে পা দিলাম একে একে সবাই। শিলচর শহরে বাসা ভাড়া হলো। সেখানেই পাঁচ ভাই বোনেরা নিজেরা রান্না বান্না করে খেয়ে যে যার পথে বেরিয়ে যেতাম। বন্ধু রা বলতো, তোদের লাইফ টা বেশ কালারফুল, বেশ বৈচিত্র্য পূর্ণ! এই যে পুজো হোক কিংবা বিভিন্ন ছুটি ছাটায় ব্যাগ উঠিয়ে বাড়ি পৌঁছে যাবার উৎসব টা তো আমাদের কারো নেই। সত্যিই তাই। এতই উত্তেজক ছিল এই বাড়ি যাবার উৎসবটা,যে আমরা ভাই বোনরা কেউ কারো অপেক্ষায় থাকতামনা । তার মানে একসাথেই সবাইকে যেতে হবে, এরকম কোনো ব্যাপার ছিলনা। যার যখন কাজ শেষ হতো, বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে পড়তাম। কখনো লাস্ট বাসে, কখনো ভিড় ঠেলে।  


                  চাবাগানের নাম ছিল সরসপুর। যার মাটিতে পা রাখলেই ভুলে যেতাম, ভিড়ে ঘর্মাক্ত পাব্লিক বাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝুলে ঝুলে আসার যন্ত্রণা। কতদিন বাসস্ট্যান্ডে পা রাখার আগেই চোখের সামনে দিয়ে লাস্ট বাসটাকে বেরিয়ে যেতে দেখেছি। কতদিন এভাবে কান্নাচোখে দাঁড়িয়ে ভেবেছি এবার কীসে বাড়ি পৌঁছুবো। যারা শহরে থেকে পড়াশোনার সুযোগ পায়, তারা কী বুঝবে মফস্বলের লড়াই। শুধু লড়াই তো নয়। অবজ্ঞা, অবহেলা সবকিছু। ঘুরেফিরে এখানেও কাজ করে যায় মেইন স্ট্রিম আর পেরিফেরির দ্বন্দ্ব। বাস থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে চাপাতার যে সৌরভ নাকে এসে ঢুকত,তাতেই সব শ্রান্তি ঘুচে যেত। এই সুবাসে মিশে আছে আমাদের শৈশব, আমাদের বয়ঃসন্ধি, আমাদের প্রেম, আমাদের অন্তহীন লড়াই। তাই বারবার ফিরে যেতে চাই সেসব দিনে। 

              পুজোর দিনগুলো ছিল পুরোপুরি আলাদা। শহরের ছেলেমেয়েরা যেভাবে পুজো কাটাত, আমরা তার থেকে অনেক আনন্দে কাটাতাম।শিলচরের বন্ধুরা বলত, দুটো মাত্র পুজো, তাও বাড়ি যাবার জন্য এত তাড়া। আমরা জানতাম, ওখানে শুধু পুজো নয়, পুজোকে ঘিরে রয়েছে আরো অনেক কিছু। কোয়ার্টারের সমস্ত প্রতিবেশিদের সক্রিয় অংশগ্রহণে পুজো একেবারে ঘরোয়া হয়ে উঠত। আমরা অপেক্ষায় থাকতাম প্রত্যেকের আনন্দে অংশীদার হতে । অপেক্ষায় থাকতাম সবাই একসাথে অঞ্জলী নিতে। সবার সাজগোজ দেখতে। 

        বাড়ি বলতে আসলে ওই কোয়ার্টারই । কোয়ার্টার ক্যাম্পাসের যে পনেরো ঘর পরিজন তাদের নিয়েই আমাদের বেড়ে ওঠা । আমাদের যাকিছু লড়াই,ওঠা- পড়া সবকিছুর সাক্ষী আসলে তারাই। তার বাইরের যে জগত ছিল তার সবটাই ছিল কেজো। দীর্ঘ বারো বছর কাটিয়েছি শিলচর শহরে। এখানেই জীবনের পাপড়িগুলো একে একে বিকশিত হয়েছিল। এখানেই সমস্ত বোধ-বুদ্ধির প্রথম জাগরণ। কত বন্ধুত্ব, কত মন দেয়া নেয়া। কিন্তু তারপর ? একসময় তাঁবু গুটিয়ে পাড়ি দিতে হয়েছে অন্য শহরে। বারো বছরের যা কিছু সঞ্চয় তাকেই বুকে বেঁধে চলে যেতে হয়েছে অন্য কোনোখানে। পড়াশোনা শেষ হলো। কিন্তু চাকুরি হলো না শিলচরে। না বাড়িও হলো না। 

                      বাড়ি হলো করিমগঞ্জে। পরিচিতির পরিসর যেখানে খুবই নগন্য। চাকুরির খোঁজে আমাকে যেতে হয়েছিল অনেক দূরে একটি শহরে। ওই যে বলছিলাম না, কোনো কোনো খড়কুটোর ভাসান কখনো থামেনা। সারাজীবন মানুষ তো শুধু টাকা উপার্জন করে না। অর্জন করে অজস্র পরিচিতি, অসংখ্য সুহৃদ। আমাদের গতিশীল জীবনে আমরা সেগুলো হারিয়েছি। আমরা চাইলেও কোনো একটা পরিচিতি কে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারিনি। বিস্মৃতির আড়ালে সেসব মুখ লুকোচ্ছে ধীরে ধীরে। কর্মসূত্রে সবাই আজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি। পুরোনো দিনগুলো পিছু ফিরে ডাকে বারবার। ফিরতে চাই তাই মাটির কাছে। তবুও কখনো কখনো মাটির গন্ধে থাকে অপরিচিতের মোহর। দ্বন্দ্ব জাগে  "কোথায় আমার দেশ, তার নেইকো কোনো শেষ"। নোঙর ফেলা সেভাবে আর হয়ে ওঠেনি । চেনা মুখগুলো অচেনা হয়ে যায় ধীরে ধীরে। চেনা আশ্রয়গুলো সরে সরে দূরত্ব তৈরি করে। আমাদের সঞ্চিত সবকিছু, অর্জিত যা কিছু সব ভৌগোলিক দূরত্বে হারিয়ে যায়। 

              বাড়ি আসলে ইট-কাঠ-সিমেন্টের কোনো নির্মাণ নয়, বাড়ি মানে প্রতিবেশি, পরিজন, আকাশ বাতাস, গাছগাছালি, ছেলেবেলার রাশি রাশি স্মৃতি। বাড়ির উঠোনে পা দিয়ে বাড়িতে ঢোকার আগেই যারা জিজ্ঞেস করতেন 'কখন আসলি,কতদিন থাকবি'। আজ তাদের থেকে আমরা শতযোজন দূরে থাকি। বাড়ি বলতে আসলে ছিল সেটাই। আজ বাড়ি একটা নয়, তিনটে। বাবার বাড়ি, শ্বশুর বাড়ি, নিজের বাড়ি। সবটাই শুধু কংক্রিটের বিল্ডিং। নিঃসঙ্গ, একাকী সেই বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে থাকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। অপরিচয়ের শ্যাওলা জমে তার গায়ে, বিবর্ণ হয় দিনদিন। তবু দাঁড়িয়ে থাকে। 


আজ অনেকদিন পর সেই স্মৃতির সরণি বেয়ে.....

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অণুগল্প

কথা