জুবিন ও কিছু কথা

 ‘রৈ রৈ বিনালে’ ও কিছু কথা


"প্রতি শৰতৰ প্রভাতী ফুলে, কব তোমাকেই মোৰ কথা/প্রতি মেঘালী নিশা জোনে কব তোমাকেই মোৰ ব্যথা।"

আদ্যোপান্ত একটি প্রেমের গান। কিন্তু গায়কের মৃত্যুর পর এই গানটি এক অন্য মোহনায় পাড়ি দিল। ঠিক যেমন নদী এসে সাগরে মিশে যায়। এক ব্যক্তি অনুভব যেন সমষ্টির অনুভবে পরিণত হলো। আমরা আজও জানিনা কী আছে গানটিতে। প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি তাল, লয়, সুরে যেন শিল্পী তার অকথিত, অলিখিত কিছু ব্যথা কষ্ট ছড়িয়ে গেছেন। আর ঠিক এমনটাই অনুভব- তার সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি 'ৰৈ ৰৈ বিনালে' দেখার পর।


          ছবিটির গল্প,কিংবা চরিত্র আমাদের খুব পরিচিত। ঠিক একই রকম বিষয় নিয়ে হয়তো নানা ভাষায় অসংখ্য ছবি তৈরি হয়েছে এদেশে। কাহিনির দিক থেকে দেখতে গেলে, পুরোপুরি গোলাকার একটি মিস্টি প্ৰেমের গল্প। ক্লাইম্যাক্সও দুর্বল। চরিত্র নির্মাণ এবং সংলাপও তেমন উচ্চ পর্যায়ের নয়। সবমিলিয়ে সাধারণ একটি প্রেমের গল্প। প্রেমের পরিণতিতেই ছবির সুখসমাপ্তি। 

       কিন্তু ছবিটির অন্তরালে যেন অন্য এক গল্প লেখা হলো। একজন অন্ধ গায়ক। যার কাছে এই রঙীন পৃথিবীর কোনও অর্থ নেই । যার কাছে অন্ধকারই একমাত্র কঠোর সত্য। তাই গ্রাম থেকে শহরে আসা গায়ক ছেলেটিকে কোনো রঙই প্রলোভিত করতে পারেনা। তার কাছে সবটাই এক রঙ। তিনি আলো ফোটান তাঁর গান দিয়ে। গানকে অনুভব করে। সেই গান যখন পণ্যে রূপান্তরিত হয়,কিংবা নিজেরই অজান্তে যখন শিল্পী হয়ে যান বাজারজাত, তখন সত্যিই কি গায়ক আর শিল্পী থাকেন? এই প্রশ্নই যেন ছুঁড়ে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে ছবিটিতে।

            ছবিটি শুরু হয় অদ্ভুত এক রাগের প্রতিক্রিয়া দিয়ে। অন্ধ গায়ক শিল্পী 'মোই না গাও' বলে যখন রাগে, অভিমানে স্টুডিও ছাড়েন, তখনই ছবিটির পরিধি নির্ধারিত হয়ে যায়। মায়ানগরীর মায়া থেকে বেরিয়ে এসে এই তীব্র প্রতিবাদ কোথাও যেন একটু অন্যরকম বাজে। কেননা সচরাচর আধুনিক ছবিগুলোতে আমরা গায়ক হয়ে উঠার লড়াই দেখি। সমস্ত প্রতিকূলতার সাথে লড়ে গায়কের সফলতা,বিফলতা,তার হতাশা এসবই চোখে পড়ে।

            কিন্তু এ নায়ক যে অন্য নায়ক। অদ্ভুত এক উদাসীনতায় শিল্পী একমুহূর্তে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াতে দুদণ্ড ভাবেন না। গান যে শুধুমাত্র মানুষের জন্য,টাকার জন্য নয়। একথা তো জুবিন নিজের জীবন দিয়েও বুঝিয়ে গেছেন। অথচ একথাতো অবিদিত নয় যে,জুবিনের গান ছাড়া আর কোনো পেশা ছিল না। গান দিয়েই তার সংসার চলত। ইচ্ছে হলেই তিনি জড়িয়ে পড়তে পারতেন,গানের জগতের লোভনীয় হাতছানিতে। এইসব লোভনীয় হাতছানির বিরুদ্ধেই জুবিনের প্রতিবাদ। আর তার প্রতিবাদই আসলে শিল্প। নইলে 'গাখীৰৰ বেপাৰও বেপাৰ, গানৰ বেপাৰও বেপাৰ'- এই কথা এত সহজ ভঙ্গিতে কে কোথায় কবে বলতে পেরেছেন? উল্টো জুবিন গার্গের মৃত্যুর পর পাশের রাজ্য থেকে সহানুভূতি জানাতে এসে এক গায়িকাকে দেখি,জুবিন স্মরণে ফেস্টিভেল পালন এবং সেই ফেস্টিভেলে তাদের আমন্ত্রণের অনুরোধ জানিয়ে যেতে। নিশ্চয় তারা বিনামূল্যে অনুষ্ঠান করার কথা বলে যাননি। আজকের পৃথিবীতে চোখ ফেরালে বলতে পারি, গানের জগত মানেই এক চাকচিক্যময় জগত। যেখানে গান মানেই রিয়েলিটি শো। অসুস্থ প্রতিযোগিতা। চড়া মেকাপ করা বিচারক। ভূয়সী প্রশংসা। আর শিল্পীরাও দামি বেশভূষা আর অলঙ্কার পরিহিত শো পিস সবাই। একটু নামডাক হলেই দামি গাড়ি,বাড়ি। আর পেছনে সিকিউরিটি। ইন্সটাগ্রামে ফলোয়ার্স। প্রোডাক্ট লঞ্চিং এটেণ্ড করা।আর ভুরি ভুরি টাকা। সেখানে গানটা যে কোথায় হারিয়ে যায়, খুঁজে পাওয়া যায় না। স্টেশনে পড়ে থাকা নিজের খেয়ালে গান করা কোনো শিল্পীকে তুলে নিয়ে গিয়ে সেই সব 'বেপারী' ঘরের সদস্য বানানোর নজিরও রয়েছে এই দেশে।


       'ৰৈ ৰৈ বিনালে' জুবিন গর্গের স্বপ্নপ্রকল্প ছিল। নিজস্ব, একেবারে নিজস্ব কিছু কথা তিনি এই ছবিতে তুলে দিতে চেয়েছেন। হয়তো সারা জীবন দিয়ে অনুভব করা তাঁর কিছু ব্যক্তিগত কথা। 'ৰৈ ৰৈ বিনালে' শব্দবন্ধটির অর্থ কান্না,অবিরত কান্না। শরতের 'প্রভাতী ফুলে মেঘালির নিশা জোনে' যে কান্না,যে ব্যথা আমাদের তিনি পৌঁছে দিতে চান ছবির মাধ্যমে । এক মুক্ত স্বাধীন শিল্পীর শিল্পীসত্তাকে যখন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে চায় এই বাজারসংস্কৃতি, তখনই শিল্পী হৃদয়ে পুঞ্জীভূত হয় কিছু ব্যথা। যদি তিনি আসলেই শিল্পী হন। আমরা ভাবতেই পারি না আজকের যুগে এমন শিল্পীর কথা যিনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন, 'আর্টিস্ট সদায় ৰাইজৰ হয়, ৰজার নহয়'। রাজনৈতিক দলের হয়ে যখন ছবির নায়ককে গান গাইতে বলা হয়, নায়কের মুখে তখন ঠিক এই সংলাপটিই বসানো হয়।‌‌ জুবিন তখন তাঁর সহশিল্পীকে বলেন 'এম এল এ' কেতিয়াও স্যাৰ নহয়, যার পৰা একো শিকিবলৈ নাই তাক স্যার নকবি"। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীরা এই ছবি দেখে যদি কিছু শিখতে পারেন।      

           জুবিন হয়তো সারাজীবন ধরে এই শোষণের শিকার‌। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং পেশাগত জীবনে। কিন্তু প্রতিবাদের সময়টুকু পেলেন না। শিল্পীর প্রতিবাদ শিল্প দিয়েই হয়। তার মোক্ষম প্রমাণ 'ৰৈ ৰৈ বিনালে'। শিল্পীর শোষণ,এ যেন এক ভেবে দেখার বিষয়ে চোখ ফেরালেন জুবিন। এ শোষণ আমাদের সমাজে-সাহিত্যে অনেক আগে থেকেই ছিল।‌আমরা যদি মধ্যযুগে চোখ রাখি, তবে হাজার হাজার এমন প্রমাণ মিলে, যেখানে কবি শিল্পীদের কোনও স্বাধীনতা ছিল না। মধ্যযুগের কবিরা সাধারণত কোনও রাজা জমিদার বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আশ্রয়ে জীবন ধারণ করতেন। তাই তাদের রচনা সব সময় পৃষ্ঠপোষকের মন যোগানোর জন্য বা তাদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ব্যবহৃত হতো। এর ফলে কবির ব্যক্তিগত বা মৌলিক সৃষ্টিশীলতা অনেক সময় খর্ব হত। মধ্যযুগের শুধুমাত্র ধর্মকেন্দ্রিক সাহিত্য রচনা এই পরাধীনতারই ফলাফল। অনেক ক্ষেত্রে শাসক শ্রেণী তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কবিদের দিয়ে নিজেদের প্রচার বা জয়গান গাওয়ার জন্য ব্যবহার করতেন। এর ফলে কবিদের তাদের নিজস্ব মতামত বা ভাবনা প্রকাশের সুযোগ থাকত না। আজও সেই সুযোগ আছে বলে মনে হয় না(???) আধুনিক যুগেও একইভাবে শাসকবিরোধী সাহিত্য কিংবা সংগীতের জন্য জেল খাটার নিদর্শন রয়েছে। 


         হ্যাঁ, সমাজ ও সাহিত্যে শিল্পীদের এই শোষণ অনাদি কাল থেকেই চলে আসছে। কিন্তু বর্তমানে শিল্পীজগতের সোনালী রূপালী আলোকে শিল্পীর একান্ত ব্যক্তিগত কষ্টগুলো আমাদের চোখে পড়ে না। কিংবা বলা যেতে পারে এইসব কষ্ট অনুভব করার মানসিকতাই এখন আর নেই। আমাদের এই ক্রমাগত ছুটে চলায় ছবিটি একটু নতুনভাবে ভাবায়‌ যেন। জুবিন গার্গ তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, এতদিনের সংগীত জগতের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে তাঁর নিজস্ব কিছু কথাই শুধু বলতে চেয়েছেন এই ছবিতে। যা অনেক গভীর ব্যথা হয়ে পৌঁছেছে আমাদের কাছে।‌ আসল শিল্পী তিনিই হন, যাঁকে ধরা যায়না , ছোঁয়া যায় না কোনো বন্ধনে বাঁধা যায় না। সেই শিল্পীর গল্পই বলতে চেয়েছেন জুবিন তাঁর ড্রিমপ্রজেক্টে। পাঁচ কোটি বাজেটের এই ছবি বত্রিশ কোটি ছাড়িয়েছে। সবার কাছে পৌঁছুক,তাঁর এই গল্প। এই তো চেয়েছিলেন শিল্পী। সার্থক তাঁর স্বপ্ন। বাকি সিনেমাটোগ্রাফি যাঁরা বোঝেন,তাঁরাই বলবেন। আমার কথা ছিল এটুকুই।


,✍️✍️ মধুমিতা সেনগুপ্ত

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অণুগল্প

কথা