অ' জুবিন দা...
অ' জুবিন দা...
লাল চন্দন কাঠের চিতায় চড়ে তুমি চলে গেলে জুবিন'দা। পৃথিবীর ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল সাক্ষর রেখে গেলে। আজ বিশ্ববাসীকে সাক্ষী রেখে তুমি অনন্তধামের পথে। এই কদিন নীরব চেয়ে থাকা আর অশ্রু ঝরানো ছাড়া কিছু করার ছিলনা কারোর। তোমার অপার্থিব শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার কন্ঠে 'অ জুবিন দা,জুবিন দা,' বলে আহ্বান এক পরম শক্তিশালী যুগপুরুষকে চিহ্নিত করেছে। জুবিন দা, অন্ধকার না হলে, আলোর মর্ম আমরা কোনোদিন বুঝিনি, বুঝবোও না। তোমার চলে যাওয়া তাই প্রমাণ করল, মানুষের মনে তোমার কী ভীষণ ভাবে বেঁচে থাকা। এই জন্মে তো অনেক আন্দোলন দেখলাম,কত প্রতিবাদ, কত দেশ দশের কত ভাঙা গড়া। কিন্তু এই মহাযাত্রা জন্ম জন্মান্তরেও ভুলবোনা। একাধারে গায়ক, সুরকার,গীতিকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্রকার এই মানুষটির এভাবে চলে যাওয়া আমরা মেনে নিতে পারিনি। আমরা একে অন্যকে জড়িয়ে কেঁদেছি, শুধু কাউকে কিছু না বলে চলে গেলে বলে নয়। কেঁদেছি আমাদের অসীম ব্যর্থতায়, তোমাকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি বলে। প্রতিটি সম্পর্ক বেঁচে থাকে যত্নে। একটুখানি যত্ন পেলে এই ভাঙনের পৃথিবীতেও আশ্চর্য এক মায়ায় মানুষ আটকে যায়। না, আমরা তাকে যত্ন করতে পারিনি। অসমের সমাজ সংস্কৃতিতে তার অবদান আমরা শুধু দুহাত তুলে গ্রহণ করেছি। বদলে তাকে প্রাপ্য সম্মান দিতে পারিনি। বরং বোহেমিয়ান জীবন, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের জন্য তাকে মাঝে মাঝে অবহেলা করেছি। কিন্তু প্রশ্ন কি জাগে না মনে, আজ যে লাখ লাখ মানুষ নাওয়া খাওয়া ভুলে রোদে বৃষ্টিতে ভিজে নেমেছে তার শেষ যাত্রায়,চতুর্থ বিশ্বরেকর্ড করে পুরো পৃথিবী কাঁপিয়েছে, তা কি শুধু আন্তর্জাতিক গায়ক বলে ? হয়তো না। সে একজন অভূতপূর্ব মানুষ বলে। মানুষকে ভালোবেসে যে তার প্রতিটি মুহূর্ত কাটিয়েছে জীবনে। অনেক আচরণের জন্য বিতর্কিত হয়েছে,স্পষ্ট সত্য কথা বলে অনেকের অস্বস্তির কারণ হয়েছে। কিন্তু কখনো কাউকে অসম্মান ,অবহেলা, আঘাত করতে দেখা যায়নি। আদ্যোপান্ত নির্লোভ, অগোছালো, শিশুসুলভ, আত্মভোলা ,বেহিসেবি একজন মহামানব। জানেন ? শুধু এজন্যেই,এজন্যেই এত মানুষের মিছিল, এত বিলম্বিত শোক। যথার্থ শিল্পী একেই বলে। গায়ক অনেকেই হন। শিল্পী সবাই হতে পারেন না। অসমের পশু পাখি থেকে শুরু করে মানুষ,বন জঙ্গল থেকে শুরু করে নদী পাহাড় সবকিছুর সাথে যার ছিল আত্মিক বন্ধন,তিনি কীভাবে অসম ছেড়ে মুম্বই পাড়ি দিতে পারেন, আপনারাই বলুন। এক সাক্ষাৎকারে হেসে হেসে বলেছেন, মুম্বই গেলে আধা জীবন ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকবে।
এভাবে তার চলে যাওয়া আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে গেল কি? কোনো ধর্ম না মানা,জাতি না মানা এই মানুষটির জন্য আজ সমস্ত ভেদাভেদের ব্যারিকেড ভেঙে গেল। তার শ্রদ্ধাঞ্জলিতে একটি গান বারবার ধ্বনিত হচ্ছিল,
যদি জীৱনৰ ৰংবোৰে/লুকা-ভাকু খেলে/যদি আশাৰ চাকিটি/উমি উমি জ্বলে/তথাপি বন্ধু আগুৱাই যাবা/পিছলৈ ঘূৰি নাচাবা'। জীবনের এই পাঠ নতুন প্রজন্মের জন্য তার শ্রেষ্ঠ উপহার। বলেছেন কত উপার্জন করছেন তার হিসেব রাখেন না, কিন্তু কাকে কত সাহায্য করতে হবে তার হিসেব থাকে তার কাছে। কত গুণী শিল্পী হয়েও কক্ষনো প্রতিযোগিতাসুলভ মনোভাব তার ছিলনা। সাফল্যের এতটা পথ পেরিয়ে এসেও আজও বিহু মঞ্চ ছাড়েননি। সাধারণ জুতো জামা পড়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। এমন একজন মাটির মানুষকে এত তাড়াতাড়ি বিদায় জানাতে হবে কে কবে ভেবেছিল! জুবিন'দা বিতর্ক ভালোবাসতেন না। সবার প্রিয় ছিলেন। এক সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করেছিল,সমস্ত দলের রাজনৈতিক নেতারা তাকে ভালোবাসেন কেন? জুবিন দা নিজে উত্তর দিতে পারেননি। হেসে বলেছেন, গানের জন্য হয়তো। তার শেষ যাত্রায় নির্দল হয়ে সমস্ত রাজনৈতিক নেতাদের এই সহযোগ অনেক কিছু শিখিয়ে গেল আমাদের। 'সবার উপরে মানুষ সত্য,তাহার উপরে নাই'।অনুরাগীর এই প্রেম, এই ভালোবাসা অন্য শিল্পীদের কাছে এক ঈর্ষণীয় রেকর্ড তৈরি করল। অনেক প্রতিষ্ঠিত,গুণী, প্রতিভাবান মানুষ আছেন এই পৃথিবীতে। কিন্তু মানুষকে ভালোবেসে যাওয়া মানুষ সবাই কি হতে পারেন? চিতাভস্মে আমাদের সব ভেসে গেলেও থেকে যায় শুধু কর্ম। অথচ কত অর্থহীন কাজে আমরা জীবনের কত সময় ব্যয় করি। কোনোকিছুকে পরোয়া করতেন না। 'ঘেন্টা' বলে উড়িয়ে দিতেন। কে কী বলল পাত্তা দিতেন না।কিন্তু এসব তো তাদেরই মানায়,যারা উৎকৃষ্ট মানুষ। আত্মকেন্দ্রিক,হিসেবি মানুষের এসব মানায় না। যাঁরা সত্যি সত্যি রাজহাঁসের মতো গলা উঁচু করে হাঁটতে জানেন, তারা রাজাই হন। জুবিন দা ঝড়ের মতো এলেন,মানুষের হৃদয় জয় করলেন। ঝড়ের মতো চলে গেলেন। আমরা শুধু তার কর্মটুকুকে আঁকড়ে বেঁচে থাকলাম। জুবিন দা আমাদের সবার, পুরো অসমবাসীর। এক অসীম ভালোবাসায় তাঁকে শেষ বিদায় জানালাম। যে ভালোবাসার কোনো রঙ নেই, রূপ নেই, আকার নেই, জলের মতো, Shapeless....এই চারদিন ধরে যে অনুভব, যে অশ্রু চেপে রেখেছিলাম এই লেখনী তার কিছুটা ।
..........যদিও এই অনুভবের শেষ নেই।
✍️ মধুমিতা সেনগুপ্ত
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন